ঢাকায় বাড়ি তৈরির নতুন আইন ২০২৫, বিল্ডিং নিয়মাবলী, পারমিট এবং ফি-এর একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা, শহরের মানচিত্রের পটভূমিতে।

Table of Contents

ঢাকায় বাড়ি তৈরির নতুন আইন ২০২৫: যে ৬টি বিস্ময়কর পরিবর্তন আপনার জানা দরকার

ঢাকায় নিজের একটা বাড়ি বা ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের পথ এখন এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে চলে আসা ২০০৮ সালের নির্মাণ বিধিমালাকে পেছনে ফেলে আসছে নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (DAP) ২০২২-২০৩৫ এবং প্রস্তাবিত ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫। এই পরিবর্তনগুলো এতটাই ব্যাপক যে ঢাকার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সব বাড়ির মালিকের জন্যই তা জানা অপরিহার্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু বিস্ময়কর ও কৌশলগত পরিবর্তন, যা আপনার বাড়ি তৈরির পরিকল্পনাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

আধুনিক ভবন যা নিরাপত্তা, পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে বিল্ডিং নিয়মাবলীর গুরুত্ব তুলে ধরে।

আকাশ ছোঁয়ার প্রস্তুতি: ঢাকার আশেপাশে বিল্ডিং হবে দ্বিগুণ উঁচু

সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) অনুযায়ী, ঢাকার প্রধান প্রান্তিক অঞ্চল যেমন কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর এবং সাভারের মতো এলাকায় বিল্ডিংয়ের উচ্চতার সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।এর পেছনের মূল কারণ হলো ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা FAR-এর পরিবর্তন। সহজ ভাষায়, FAR হলো একটি অনুপাত যা নির্ধারণ করে একটি নির্দিষ্ট জমিতে মোট কত বর্গফুট বা বর্গমিটার নির্মাণ করা যাবে।

ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR) এবং ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ (MGC) এর চিত্র এবং ঢাকার বিল্ডিং প্রকল্পের জন্য গণনার উদাহরণ।

নতুন পরিকল্পনায় অনেক এলাকার জন্য এই FAR উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মিরপুর ডিওএইচএস-এ FAR ২.৫ থেকে বেড়ে ৪.৮ এবং খিলক্ষেতে ২.০ থেকে বেড়ে ৪.৪ হয়েছে। মোহাম্মদপুরে এই অনুপাত ২.৭ থেকে ৩.৪ এবং সাভারে ২.০ থেকে ৩.৪ করা হয়েছে।এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি দ্বিমুখী কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে। ডেভেলপার এবং রিয়েল এস্টেট খাত মনে করে, এই উদ্যোগ স্থবির আবাসন খাতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গতি আনবে এবং ঢাকার আবাসন সংকট সমাধান করবে।

অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে ট্র্যাফিক এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা, যেমন পানি ও বিদ্যুতের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।স্থবির আবাসন খাত অবশেষে গতি ফিরে পাবে। উচ্চতার সীমা বৃদ্ধি কেবল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও উদ্দীপিত করবে। — লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (REHAB)

৫ কাঠা জমিতেই সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) বাধ্যতামূলক

ঢাকার নির্মাণ নিয়মাবলীতে বিল্ডিং সেটব্যাক, উচ্চতার সীমাবদ্ধতা এবং রাস্তার প্রস্থের প্রয়োজনীয়তার চিত্র।

নতুন পরিবেশগত নিয়মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো, পাঁচ কাঠা বা তার চেয়ে বড় যেকোনো প্লটে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা।

সহজ কথায়, STP হলো এমন একটি ব্যবস্থা যা একটি বিল্ডিংয়ের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় উৎপন্ন বর্জ্য পানিকে শোধনের মাধ্যমে দূষণমুক্ত করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শোধিত পানি নিষ্কাশন লাইনে ছাড়ার আগে সেটিকে পরিবেশগতভাবে নিরাপদ করা, যার ফলে ঢাকার দূষিত নদী ও খালগুলো রক্ষা পাবে।

এই নিয়ম জমির মালিক ও ডেভেলপারদের জন্য নতুন খরচ এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি করেছে। বাড়তি পরিবেশগত সুবিধা হিসেবে, সরকার এখন এই শোধিত পানির কমপক্ষে ৬০-৭৫% টয়লেট ফ্ল্যাশিং এবং বাগান করার মতো কাজে পুনঃব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে।

বাড়ি তৈরির খরচ বাড়ছে: সরকারি অনুমোদন ফি বেড়েছে কয়েক গুণ

প্রস্তাবিত ২০২৫ সালের বিধিমালায় ভবন নির্মাণের অনুমোদনের জন্য সরকারি ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিছু সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন, ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র এবং বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদনের জন্য বেস আবেদন ফি ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা করা হচ্ছে।

ক্রেন সহ শহরের দৃশ্য, যা ২০২১ সাল থেকে কার্যকর ঢাকার বিল্ডিং নির্মাণ পারমিটের নতুন ফি কাঠামোকে উপস্থাপন করে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ফ্ল্যাট ফি পদ্ধতির পরিবর্তে এখন থেকে মোট ফ্লোর এলাকার ওপর ভিত্তি করে ফি গণনা করা হবে, যার ফলে বড় প্রকল্পগুলোর অনুমোদনের খরচ ব্যাপকভাবে বাড়বে। যেমন, একটি ৩,০০০ বর্গমিটারের বিল্ডিং অনুমোদনের জন্য যেখানে আগে ২৬,০০০ টাকা লাগতো, নতুন নিয়মে সেখানে খরচ হতে পারে ১,৫০,০০০ টাকা।

এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব বাড়বে, তেমনই রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (REHAB) সতর্ক করেছে যে এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপরই চাপানো হবে, যা আবাসনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে।

মেট্রোরেলের পাশে বাড়ি? পাবেন বাড়তি ফ্লোর নির্মাণের সুযোগ

নতুন পরিকল্পনায় ট্রানজিট-ভিত্তিক উন্নয়ন বা Transit-Oriented Development (TOD) নামে একটি আধুনিক ধারণা আনা হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, যদি আপনার জমি কোনো মেট্রোরেল (MRT) স্টেশন থেকে ৫০০-৮০০ মিটারের মধ্যে (৫-১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে) অবস্থিত হয়, তবে ডেভেলপাররা “ইনসেনটিভ FAR” পাবেন।

সহজ ভাষায়, এই “ইনসেনটিভ FAR” হলো একটি বোনাস, যার মাধ্যমে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ফ্লোর বা তলা নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যায়। এই বোনাসের পরিমাণ ০.৫ পর্যন্ত হতে পারে।এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোর চারপাশে একটি হাঁটা-বান্ধব এবং মিশ্র-ব্যবহারের (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) এলাকা তৈরি করা। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যাম হ্রাস করা এবং স্টেশন এলাকাগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব হবে।

৫ বছরের হয়রানি শেষ: আসছে ‘আজীবন বসবাস যোগ্যতা সনদ’

পুরানো নিয়মে, একটি বিল্ডিং নির্মাণের পর মালিকদের একটি বসবাস যোগ্যতা সনদ বা Occupancy Certificate নিতে হতো, যা মাত্র পাঁচ বছরের জন্য বৈধ ছিল এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর নবায়ন করার প্রয়োজন হতো।তবে ২০২৫ সালের সংস্কারে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে—প্রস্তাবিত “আজীবন বসবাস যোগ্যতা সনদ”।এই নতুন নিয়মে, একবার সনদ ইস্যু করা হলে তা আর নবায়নের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে বাড়ির মালিকদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক হয়রানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

আপনার রান্নাঘর বা জানালারও আছে আইনগত মাপ

এটি একটি বিস্ময়কর তথ্য হলেও, বিল্ডিং কোডের একটি পুরোনো নিয়ম যা সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। আপনার বাড়ির প্রতিটি ঘরের আকারেরও একটি নির্দিষ্ট আইনি মাপ রয়েছে।যেমন, আপনার রান্নাঘরের ক্ষেত্রফল কখনোই ৪ বর্গমিটারের কম হতে পারবে না।

একইভাবে, একটি শোবার ঘরের মোট মেঝের ক্ষেত্রফলের কমপক্ষে ১৫% পরিমাণ জায়গা জুড়ে জানালা থাকতে হবে (উদাহরণস্বরূপ, একটি ১০০ বর্গফুটের ঘরের জন্য কমপক্ষে ১৫ বর্গফুটের জানালা থাকা বাধ্যতামূলক)।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) থেকে আসা এই নিয়মগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়; ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরে জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং বাসযোগ্যতার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করার জন্য এগুলো অপরিহার্য।

স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কার্যকরী ব্যবহার এবং অগ্নি নিরাপত্তার প্রতীক, ঢাকার আবাসিক ভবনগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী তুলে ধরে।
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা: ঢাকার বিল্ডিংগুলিতে বায়ুচলাচল, কার্যকরী নকশা এবং অগ্নি নিরাপত্তা কভার করে এমন অপরিহার্য নিয়মাবলী।

উপসংহার

ঢাকার নির্মাণ জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। একদিকে যেমন উঁচু, ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল ভবনের দিকে শহর এগোচ্ছে, তেমনই পরিবেশগত সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর জন্য নতুন নিয়মও আসছে। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন নিয়মকানুন কি পারবে ঢাকাকে একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য মেগাসিটিতে পরিণত করতে, নাকি বাসিন্দাদের জন্য নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে?

তথ্যসূত্র (Sources)

Elite Consultation

Secure Your Property’s Future with Dhaka’s Most Trusted Engineers. Don’t gamble with your home’s safety. Consult with the firm that has shaped Dhaka’s skyline for 40 years.

Frequently Asked Question

ঢাকায় বাড়ি তৈরির নতুন আইন মূলত DAP ২০২২-২০৩৫ ও প্রস্তাবিত ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে, যা ২০০৮ সালের বিধিমালাকে প্রতিস্থাপন করবে।

আবাসন সংকট মোকাবিলা ও জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে DAP অনুযায়ী FAR বৃদ্ধি করা হয়েছে, ফলে কেরানীগঞ্জ, সাভার ও হেমায়েতপুরে ভবনের উচ্চতা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে।

FAR (Floor Area Ratio) নির্ধারণ করে একটি জমিতে কতটুকু নির্মাণ করা যাবে। FAR বাড়লে একই জমিতে বেশি ফ্লোর নির্মাণ করা যায়, যা সম্পত্তির বাণিজ্যিক মূল্য বাড়ায়।

পাঁচ কাঠা বা তার বেশি জমিতে STP বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যাতে ভবনের বর্জ্য পানি শোধন করে পুনঃব্যবহার করা যায় এবং নদী-খাল দূষণ কমানো যায়।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী STP থেকে শোধিত পানির অন্তত ৬০-৭৫% টয়লেট ফ্লাশিং ও ল্যান্ডস্কেপিং কাজে পুনঃব্যবহার বাধ্যতামূলক।

ফ্ল্যাট ফি বাদ দিয়ে মোট ফ্লোর এরিয়ার ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করায় বড় প্রকল্পের অনুমোদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৫০০-৮০০ মিটারের মধ্যে জমি থাকলে ০.৫ পর্যন্ত Incentive FAR পাওয়া যাবে, ফলে অতিরিক্ত ফ্লোর নির্মাণ সম্ভব হবে।

এটি একটি নতুন Occupancy Certificate যা একবার ইস্যু হলে আর নবায়নের প্রয়োজন হবে না, ফলে বাড়ির মালিকদের প্রশাসনিক ঝামেলা কমবে।

BNBC অনুযায়ী রান্নাঘরের ন্যূনতম আয়তন ৪ বর্গমিটার এবং প্রতিটি শোবার ঘরের জানালার আয়তন মোট ফ্লোর এরিয়ার কমপক্ষে ১৫% হতে হবে।

Related Posts